সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরটির রফতানি আয় সামান্য বাড়লেও আমদানি কার্যক্রম ভেঙে পড়ায় সরকারের রাজস্ব আহরণ কমেছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর না হলে এ স্থলবন্দরের সম্ভাবনা আরো সংকুচিত হতে পারে।
আখাউড়া স্থলবন্দর শুল্ক স্টেশনের তথ্যানুযায়ী, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে এ বন্দর দিয়ে ভারতে ৫২৪ কোটি ২ লাখ ৮৯ হাজার টাকার পণ্য রফতানি হয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রফতানি হয়েছিল ৫১৪ কোটি ৩৪ লাখ ২৪ হাজার টাকার। অর্থাৎ এক বছরে রফতানি বেড়েছে মাত্র ৯ কোটি ৬৮ লাখ ৬৫ হাজার ১৭৯ টাকা বা প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বন্দরটির সক্ষমতার তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত নগণ্য।
জানা যায়, এক সময় বহুমুখী পণ্য রফতানির জন্য পরিচিত আখাউড়া স্থলবন্দর এখন কার্যত কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে হিমায়িত মাছ, সিমেন্ট, শুঁটকি, আটা-ময়দা ও ভোজ্যতেলসহ সীমিত কয়েকটি পণ্য রফতানি হচ্ছে। এসব পণ্য আগরতলা হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে সরবরাহ করা হয়। অথচ কয়েক বছর আগেও এ বন্দর দিয়ে প্লাস্টিকজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, জুস, পিভিসি সামগ্রী, তুলাসহ নানা ধরনের পণ্য রফতানি হতো।
ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২৫ সালের ১৭ মে ভারত সরকার আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে প্লাস্টিক পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ফলের স্বাদযুক্ত জুস, পিভিসি সামগ্রী ও তুলাসহ বেশ কয়েকটি উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর থেকেই রফতানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। হিমায়িত মাছ ছাড়া অধিকাংশ সম্ভাবনাময় রফতানি পণ্যের বাজার কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে আমদানি পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-জুন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস ভারত থেকে কোনো পণ্যই আমদানি হয়নি। পুরো অর্থবছরে আমদানি হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৯৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকার চাল, আগরবাতি ও জিরা। এসব পণ্য থেকে সরকারের রাজস্ব আহরণ হয়েছে মাত্র ৭১ লাখ ৩২ হাজার ৫৯৩ টাকা। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ বন্দর দিয়ে ৭ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার টাকার পণ্য আমদানি হয়েছিল। সে সময় রাজস্ব আহরণ হয়েছিল ৪ কোটি ১৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আহরণ কমেছে প্রায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বা প্রায় ৮৩ শতাংশ।
ব্যবসায়ীদের মতে, আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে যেসব পণ্য আমদানির অনুমতি রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ত্রিপুরার বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এবং আমদানিকারকদের কাঙ্ক্ষিত মুনাফা থাকে না। ফলে অনেক ব্যবসায়ী আমদানি কার্যক্রম থেকে সরে গেছেন।
আখাউড়া স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী রাজীব উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘দীর্ঘ সময় পার হলেও ভারত উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন পণ্যের ওপর দেয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। ফলে হিমায়িত মাছের পর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রফতানি পণ্যগুলোর রফতানিও বন্ধ রয়েছে।’
আরেক ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আমদানির সুযোগ না থাকলে সীমিত পণ্যের অনুমতি দিয়ে আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়।’ লোকসান দিয়ে দীর্ঘদিন ব্যবসা পরিচালনা করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আখাউড়াআমদানি-রফতানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি নিছার উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ভারত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি রফতানি।’ দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
আখাউড়া স্থলবন্দর শুল্ক স্টেশনের সহকারী কমিশনার শেখ সাহির আহমেদ বলেন, ‘আমদানি অনিয়মিত হওয়ায় রাজস্ব আহরণ কমেছে। তবে ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে।’ এছাড়া সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমতির দাবির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, আখাউড়া স্থলবন্দরের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর, রফতানি ও আমদানিযোগ্য পণ্যের তালিকা সম্প্রসারণ এবং বাস্তবসম্মত আমদানি নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। অন্যথায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক সক্ষমতা আরো সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।